মার্কিন শুল্কের প্রভাব এড়াতে নতুন বাজার খুঁজছেন চীনা ব্যবসায়ীরা

অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদা পুনরুদ্ধার না হওয়ায় গত কয়েক বছরে চীনের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে রফতানি খাত।

অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদা পুনরুদ্ধার না হওয়ায় গত কয়েক বছরে চীনের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে রফতানি খাত। কিন্তু রমরমা এ বাণিজ্যে বাগড়া দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কজনিত বাণিজ্যযুদ্ধ। এতে দেশটির প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প বাজার খুঁজছেন চীনা উৎপাদকরা। একই সঙ্গে বিদেশে কারখানা খোলার মাধ্যমে স্থানীয় সরবরাহ চেইনে কাজ করার সুযোগ খুঁজছেন।

ইউরো নিউজের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, রফতানি বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত ট্রেড ফেয়ারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে চীন। এসব আয়োজনে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য প্রদর্শন করে নতুন বিক্রি চ্যানেল তৈরির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঐতিহ্যবাহী বাজারের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করছে।

চীনে আয়োজিত বাণিজ্য মেলাগুলোর মধ্যে বড় দুটি হলো ক্যান্টন ফেয়ার ও চায়না ইন্টারন্যাশনাল কনজিউমার প্রডাক্টস এক্সপো (সিআইসিপিই)।

গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংঝৌ শহরে চলমান এবারের ক্যান্টন ফেয়ারের স্টলগুলো চীনা রফতানিকারকদের কাছে খুবই চাহিদাসম্পন্ন। কারণ তারা মার্কিন শুল্কচাপ এড়াতে বিকল্প বাজারে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান। এ মেলায় নিজের কোম্পানির প্রযুক্তিপণ্য নিয়ে এসেছে ব্যবসায়ী তাং শৌশেং। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিদেশে বাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে তার কোম্পানি। মেলায় সর্বাধুনিক ফিচারসমৃদ্ধ পণ্য এনেছেন তারা। এরই মধ্যে পোল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের পরিবেশকদের কাছ থেকে চুক্তির আহ্বান পেয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, শুধু বিক্রি বৃদ্ধিই নয়, চীনা রফতানিকারকরা বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বিদেশে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন।

মেলায় অংশ নেয়া আরেক ব্যবসায়ী হুয়াং শুয়ু বলেন, ‘আমরা প্রায় ১ কোটি ইউয়ান (প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার) বিনিয়োগ করে বিদেশে কারখানা গড়ার পরিকল্পনা করছি। এরই মধ্যে আমরা প্যাকেজিং উপকরণে স্থানীয় সরবরাহকারীদের খুঁজে পেয়েছি।’

চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের মাঝে ক্যান্টন ফেয়ারের কলেবর বেড়েছে বলেও জানান এর আয়োজকরা। তারা বলছেন, ৫ মে পর্দা নামতে যাওয়া এবারের মেলায় প্রায় ৩১ হাজার প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে, যা আগের মেলার তুলনায় প্রায় ৯০০ বেশি। অর্থাৎ মার্কিন শুল্ক এড়াতে চীনা ব্যবসায়ী মরিয়া অবস্থানে রয়েছেন।

সম্প্রতি চীনে শেষ হয়েছে আরেক বড় ট্রেড ফেয়ার সিআইসিপিই। সেখানে অনেক চীনা রফতানিকারককে নতুন পণ্য নিয়ে আসতে দেখা গেছে। তারা নিজেদের ব্র্যান্ড ও সরবরাহ চেইনে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছেন। মূলত অনিশ্চিত বাণিজ্য পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই করছে এসব কোম্পানি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য বিশেষায়িত ব্র্যান্ড চালু করছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করছে।

সিআইসিপিইতে অংশ নেয়া ব্যবসায়ী রান ইয়ান বলেন, ‘আমরা গত বছর থেকে নিজেদের ব্র্যান্ড চালু করেছি। আমাদের নতুন এ পণ্যগুলো রুশ বাজারে দারুণ পারফর্ম করছে।’

বাণিজ্যিক বাধার পরেও অনেক প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক সম্প্রসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকছে বলে জানান আরেক ব্যবসায়ী লি রোংশোং। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সামগ্রিক ব্র্যান্ড কৌশলের অংশ হিসেবে বৈশ্বিক শিল্প কাঠামো ত্যাগ করিনি।’

খুচরা প্লাটফর্ম টেমুতে পণ্য সরবরাহ করেন গুয়াংজুভিত্তিক এমন এক বিক্রেতা সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানান, অনেক বিক্রেতা জর্ডানের মতো তৃতীয় দেশে কারখানা তৈরি করছে, যাতে সেখানে পণ্য তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা যায়। আবার অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, এমন দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর পথ খুঁজছে।

ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিসরে চীন-মার্কিন বিরোধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাণিজ্যযুদ্ধের রূপান্তরের সাম্প্রতিক প্রবণতা পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে বলে একাধিক সংস্থা এরই মধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, যা কিনা পণ্য বাণিজ্য সংকোচনের পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একসময় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার ছিল চীন। এখন যদি শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশ থেকে ওই পণ্য কিনতে পারে। আবার চীনও রফতানির জন্য বিকল্প বাজার খুঁজবে। চীন যদি এখন আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার মতো তৃতীয় পক্ষের কাছে পণ্য রফতানি শুরু করে, তবে সেসব দেশের স্থানীয় উৎপাদকরা বড় ধরনের প্রতিযোগিতায় মুখে পড়ে যাবে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর আমেরিকা বাদে অন্য অঞ্চলে চলতি বছর চীনা পণ্যের রফতানি ৪-৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সম্প্রতি পূর্বাভাস দিয়েছে ডব্লিউটিও।

এদিকে গত মার্চে চীনের রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। কারণ বাড়তি শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগেই রফতানি শেষ করার জন্য তড়িঘড়ি ক্রয়াদেশ দেন অনেক কোম্পানি। তবে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, সামনে চীনের রফতানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে।

আরও